চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) জি৭ ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে যুক্তরাজ্য। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের (ওএনএস) বৃহস্পতিবার প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, পঞ্জিকাবর্ষের প্রথম তিন মাসে যুক্তরাজ্যের জিডিপি দশমিক ৭ শতাংশ হারে বেড়েছে আগে এক পূর্বাভাসে তা দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছিলেন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদরা। এ প্রবৃদ্ধিকে বর্তমান লেবার সরকারের গৃহীত অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনার জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। খবর ইউরো নিউজ।
গত এক বছরে এটি যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক প্রবৃদ্ধি অর্জন। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ফ্রান্সসহ জি৭ভুক্ত অন্যান্য দেশের তুলনায় এবার এগিয়ে রয়েছে ব্রিটেন। তুলনা করে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে দশমিক ৪ শতাংশ ও ইউরোজোনে গড় প্রবৃদ্ধি দশমিক ৩ শতাংশ।
যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস এ প্রবৃদ্ধি অর্জনকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘জি৭ দেশের মধ্যে আমরা এ বছরের শুরুতে সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে এখনো অনেক কিছু করার আছে।’ তিনি উত্তর ইংল্যান্ডের ডার্বি শহরে রোলস-রয়েসের একটি কারখানা পরিদর্শনের সময় এসব কথা বলেন।
কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার সঙ্গে লড়াই করে আসা যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি এবার কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে দেশটির মোট উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশে অবদান রাখা সেবা খাত এবার ভালো করেছে। অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তি, আর্থিক সেবা ও হসপিটালিটি খাত সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
এছাড়া নির্মাণ খাত থেকে মাঝারি মাত্রার অবদান এসেছে। উৎপাদন খাতে মিশ্র ফল দেখা গেলেও সরবরাহ চেইন ও বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট অনিশ্চয়তার প্রভাব লক্ষণীয় ছিল। ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে খারাপ পারফরম্যান্সের পর খুচরা বিক্রয়ে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি কমে আসা ও ভোক্তা আস্থার উন্নতি সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এ প্রবৃদ্ধি হয়তো খুব বেশিদিন স্থায়ী হবে না। ডয়চে ব্যাংকের যুক্তরাজ্যবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ সঞ্জয় রাজা বলেন, ‘২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি কমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল থাকায় ও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কবৃদ্ধির কারণে রফতানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।’
এপ্রিলে যুক্তরাজ্যে ব্যবসায়িক কর বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। গৃহস্থালি পর্যায়ে বিদ্যুৎ ও পানির বিলও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এ ব্যয়বৃদ্ধির কারণে ভোক্তারা খরচ কমিয়ে দিতে পারে এবং বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশও বেশ অনিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি বিশ্ববাণিজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যদিও সাময়িকভাবে ৯০ দিনের জন্য ব্রিটিশ পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক স্থগিত করা হয়েছে, তবু দীর্ঘমেয়াদে রফতানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার আলাদাভাবে একটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির খসড়া প্রকাশ করেন। এ চুক্তিতে গাড়ি, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে যুক্তরাজ্যের ওপর চাপ কমানো হয়েছে, যদিও ১০ শতাংশ মূল শুল্ক এখনো বহাল রয়েছে।
কিছুটা ইতিবাচক পদক্ষেপের পরও বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা এখনো যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি কতটা স্থিতিশীল, তা পর্যবেক্ষণ করছেন। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড বর্তমানে সুদহার ৫ দশমিক ২৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। তবে সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, আগামী কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতি আরো কমতে পারে।
বছরের শুরু থেকে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় বেশি হওয়ায় ভোক্তা আস্থা কিছুটা বেড়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, ব্যয়বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তা থাকলে দ্বিতীয় প্রান্তিকে এ আস্থা আবার কমে আসতে পারে।
রয়টার্স পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাজ্যের জিডিপি প্রবৃদ্ধি দশমিক ৩ থেকে দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। পুরো বছরের জন্য সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ১ থেকে ১ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
লেবার সরকার দেশের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোকে তাদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। সরকার এরই মধ্যে পরিকাঠামো, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও শিল্প উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে হলে সরকারকে ব্যবসাবান্ধব নীতি, রফতানি খাত ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়তা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কর কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণনীতি নিয়ে আরো স্বচ্ছতা দরকার, যাতে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ বাড়ানো যায়।
২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাজ্যের শক্তিশালী পারফরম্যান্স আশার আলো দেখালেও ভবিষ্যতে এ ধারা ধরে রাখা ব্রিটিশ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।